অপরাধ,অপরাধী এবং "ট্রু ক্রাইম" - পারমিতা বন্দ্যোপাধ্যায়

 

 

বই – ট্রু ক্রাইম

লেখক – তমোঘ্ন নস্কর

প্রকাশনী – শব্দ প্রকাশন

প্রথম প্রকাশ – নভেম্বর ২০১৯

প্রচ্ছদ শিল্পী –  চিরঞ্জীৎ দাস

পৃষ্ঠা –১৫২

মুদ্রিত মূল্য - ১৭৫

 

ইদানিং কালের লেখকদের মধ্যে তমোঘ্ন নস্কর নিঃসন্দেহে অন্যতম জনপ্রিয় ও শক্তিশালী লেখনীর অধিকারী। ওঁর লিখিত “দেও”-র মাধ্যমে নবীন লেখকের লেখার সাথে পরিচয়। লেখনী এবং বিষয়বস্তুর মৌলিকতা যে  মুগ্ধতা ছড়িয়েছিল তার ফল স্বরূপ পরবর্তী সময়ে ওঁর লেখা আরও বেশ কিছু বই পড়া হয়ে গেছে। এমতাবস্থায় সত্য ঘটনা সম্বলিত অপরাধ নিয়ে লেখা “ট্রু ক্রাইম” সম্পর্কে জানতে পারি। মাস তিন আগে ছোট্ট আকারের আকর্ষণীয় প্রচ্ছদের বইটি অতঃপর জোগাড় করি এবং প্রায় এক বসায় পড়েও ফেলি। এই সময়কালের মধ্যে লেখকের সাথে ব্যক্তিগত আলাপ করার সৌভাগ্য হয় এবং অন্যান্য বইয়ের সাথে সাথে এই বইয়ের বিষয়েও আলোচনা হয়। তখনই জানতে পারি এটি তাঁর লেখা প্রথম বই। এবং সদ্য জন্মানো প্রকাশনী সংস্থারও প্রায় প্রথম ধাপের বই। একজন আদ্যপান্ত ঘরোয়া, অত্যন্ত সরল মনের, ভদ্র স্বভাবের প্রকৌশলবিদ কেন নিজের প্রথম বইয়ের বিষয় হিসাবে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে ঘটা ঘৃণিত অপরাধকে বেছে নিয়েছিলেন তা সত্যিই বিস্ময়কর।    

 

অপরাধ সংক্রান্ত বিষয়ে সত্য ঘটনা অবলম্বনে লেখা বই খুব স্বাভাবিক ভাবেই পাঠক মহলে সাদরে সমাদৃত হয়। বাংলা সাহিত্যে এই বিষয়ে বিস্তারিত ভাবে লেখা বইয়ের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় জোগান যথেষ্ট কম। তাই যখন কেউ এই বিষয়ে লেখেন এবং ঘটনাগুলোর সময় কাল যখন সুদূর অতীত হয়, তখন তার জন্য বেশ অনেকটা গবেষণা প্রয়োজন হয়। যা যথেষ্ট পরিশ্রমসাধ্য ও ধৈর্যের ব্যাপার হয়। তাই এই ধরণের প্রচেষ্টা সব সময়েই প্রশংসনীয়।

মোট কুড়িটি খুনের ঘটনা নিয়ে “ট্রু ক্রাইম” লিখিত। ইতিহাসের কুড়িজন মারাত্মক সিরিয়াল কিলারের ঘৃণিত আখ্যান বর্ণনা করা হয়েছে এই স্বল্প দৈর্ঘ্যের বইটিতে। এদের মধ্যে কেউ রাজা, কেউ রাণী যেমন আছেন, তেমনি আছেন সাধারণ মানুষও। সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে উঠে এসে নিজেরদের অপরাধের মৌলিকত্ব প্রমাণ করলেও, শেষ পর্যন্ত প্রত্যেকে এক বিন্দুতে এসে দাঁড়ান। তাঁদের পরিচয় হয় জঘন্য খুনী রূপে। ক্ষমতালোভী, নারীলোলুপ, শিশুকামুক, ডাকাত, রক্তপিপাসু  বিভিন্ন প্রকারের মানসিক অবস্থা তাদের। কিন্তু মানুষের প্রাণের দাম প্রত্যেকের কাছেই খোলামকুচির সমান।

ইতিহাসের অতলে হারিয়ে যাওয়া অপরাধের তথ্য জোগাড় করে তাকে কাহিনী আকারে পেশ করা বেশ দুঃসাধ্যের কাজ। কারণ অতি প্রাচীন ঘটনাবলী সম্পর্কে বিস্তারিত সঠিক তথ্য সহজলভ্য নয় মোটেই। প্রচুর পড়াশোনা করে লেখক এই সমস্ত তথ্য থেকে রস আহরন করে নিজ লেখনীর মেধায় সেই অসাধ্য সাধন করেছেন, তার জন্য তাঁকে কুর্নিশ অবশ্যই জানানো উচিত। রীতিমত পৈশাচিক কাণ্ড কারখানায় লিপ্ত অপরাধীদের শৈশব থেকে তাদের অপরাধ জগতে প্রবেশের পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা বেশ চমকপ্রদ। বিশেষ করে প্রাচীন ইতিহাসে ঘটে যাওয়া জঘন্যতম অপরাধ ও অপরাধের গতি প্রকৃতি পড়ে বিস্ময়বিমূঢ় হতে হয়।

সাধারণত অপরাধ নিয়ে এই ধরণের বই লিখতে গিয়ে অধিকাংশ লেখক অপরাধীর অপরাধ প্রবণতা, তার ঘৃণিত মন – মানসিকতা প্রভৃতি বর্ণনাকালে একরাশ বিতৃষ্ণা পেশ করেন। যা মোটেই অস্বাভাবিক নয়। যাতে পাঠকেরও মনে তাদের প্রতি শুধুই ঘৃণা ও বিরক্তির উদ্রেকই করে। মনে মনে প্রত্যেকেই তাদের কঠিনতম শাস্তির বিধান দিয়ে দেন। এই গল্পগুলো পড়লেও একই রকম প্রতিক্রিয়া আসা স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু এইখানে সাহিত্য জগতে  সদ্য পদার্পণ করা লেখক একটু অন্য রকম ভেবেছিলেন। তিনি অপরাধীদের মনস্তত্ব নিয়েও পড়াশোনা করেছেন। এবং একজন মনোবিজ্ঞানীর দৃষ্টিভঙ্গীতে একজন মানুষ কেন – কিভাবে এত বিকৃত মানসিকতা লাভ করতে পারে, কোন মানসিক আঘাত বা অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে একজন মানুষ তার সমস্ত মানবিক প্রবৃত্তি পরিত্যাগ করে সম্পূর্ণ অপ্রাকৃত অমানবিক আচরণে লিপ্ত হয়, তার ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। এর অর্থ এটা নয় যে লেখক খুনীদের অপরাধকে, অপরাধ প্রবৃত্তিকে সমর্থন করছেন বা ন্যায্যতা দাবী করেছেন। শুধু জানানোর চেষ্টা করেছেন একজন কোমলমতি শিশু কি করে কোন কোন পরিস্থিতিতে কিংবা কি ধরণের পাশবিক অত্যাচারের ফলে ধীরে ধীরে নরপশুতে পরিণত হয়। এর থেকে পাঠকও এই বিষয়ে বেশ কিছু শিক্ষালাভ করেন, যা আখেরে আমাদের সমাজের মঙ্গলের পথই দেখায়। একজন পাঠক হিসাবে বইয়ের এই বিশেষ বিষয়টি আমার সবথেকে বেশি ভালো লেগেছে। বাস্তব জীবনে সমাজের ভিন্ন ভিন্ন স্তরে আমাদের আশেপাশে, এমনকি আমাদের মধ্যেই এই সমস্ত বিকৃত মানসিকতার মানুষ ছড়িয়ে আছেন। তাদের বিষয়ে ওয়াকিবহল হতে এই বই সাহায্য অবশ্যই করে। সেদিক থেকেও এই বই অবশ্য পাঠ্য রূপে বিবেচিত হবে। সাথে প্রত্যেক খুনির আসল ছবি দেওয়ায় গল্পে অন্য মাত্রা যোগ হয়েছে।  

 

লেখক ও প্রকাশনা দুজনেরই প্রথম প্রকশিত বই হওয়ায় বেশ কিছু ত্রুটি এই বইয়ে আছে।

প্রথমত  - বইয়ের বাঁধাই খুব শক্তপোক্ত নয়। ভেতর থেকে পৃষ্ঠা খুলে আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।  

দ্বিতীয়ত -  বইয়ের প্রুফ রিডিং এর ক্ষেত্রে বেশ অযত্নের ছাপ রয়ে গেছে। অল্প বিস্তর বানান ভুল যদিও তেমন উল্লেখযোগ্য নয় কিন্তু লেখার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সাজসজ্জার অভাব যথেষ্ট চোখে লাগে। এই বিষয়ে প্রথমেই উল্লেখ করা দরকার গল্পগুলোর শুরু ও শেষ নির্দেশ করা পরিষ্কার নয়। গল্পের শুরুতে বা গল্পের মধ্যে বিভাগ সমুহের যে নামকরণ করা হয়েছে তা পৃথকভাবে লেখা হয়নি। ফলে অনেক সময়েই পরবর্তী গল্প শুরু হয়ে গেছে বুঝতে অসুবিধা হওয়ায় পাঠক ভ্রান্ত হন। কিছু স্থানে হঠাৎ করে অপ্রয়োজনীয়ভাবে ইংরাজি অক্ষর ব্যবহার করা হয়েছে। যা মনযোগী হলে অনায়াসে দূর করা যেত। শব্দ প্রকাশনের অপর একটি বই “কৃষ্ণপক্ষ” সম্পর্কেও এই একই প্রকারের ত্রুটি নজরে আসে।  

তৃতীয়ত - ফেসবুকের একটি গল্প লেখার গ্রুপে নিজের লেখা গল্প প্রকাশ করা দিয়ে যে যাত্রা লেখক শুরু করেছিলেন, পরবর্তীতে তার পরিপূর্ণ রূপ বই আকারে প্রকাশিত হওয়ার সময় সামাজিক মাধমের পোস্ট ও বইয়ের গল্পের মধ্যে যে প্রভেদ থাকে তা দূর করে দিলে ভালো হত। সেক্ষেত্রে কিছু গল্প আরও খানিকটা বিস্তারিত লিখলে খুব খুশি হতাম।

আশা করব পরবর্তী সংস্করণে এই সামান্য ত্রুটি বিচ্যুতি মুক্ত হয়ে এই বই সমহিমায় বাংলা সাহিত্য উজ্জ্বল করবে। তবে বইয়ের শেষে তথ্য জোগাড়ের হেতু লেখক যে সমস্ত বই বা রেফারেন্স পড়েছিলেন, তার একটি তালিকা প্রকাশ করা আছে। এই বিষয়ে আগ্রহী পাঠকেরা সেই খান থেকে আরও বিস্তারিত বহু ঘটনা পড়তে ও জানতে পারবেন। যা অতিরিক্ত পাওনা হিসাবেই গণ্য হবে।  আগামী দিনের জন্য লেখক ও প্রকাশন সংস্থাকে জানাই শুভেচ্ছা ও শুভ কামনা। আরও উন্নত গুণগতমানের বই প্রকাশের মাধ্যমে বাংলা সাহিত্য ভাণ্ডার ভরে উঠুক এই আশা রাখি।      

 

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন