ভারতের প্রথম নারী শহিদ - প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার

 

প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার    

 

"কারার লৌহকপাট

ভেঙ্গে ফেল কর রে লোপাট,

রক্ত-জমাট শিকল পূজার পাষাণ-বেদী।

-       কাজী নজরুল ইসলাম

 'কারার ঐ লৌহকপাট' গানটি শুনলেই মনটা কেমন যেন করে ওঠে। গানটি শুনতে শুনতে বহু আত্মত‍্যাগী বিপ্লবীদের কথা মনে পড়ে যায়। তাঁরা দেশ মাতৃকাকে স্বাধীন করার জন‍্য ব‍্যক্তিগত সুখ স্বাচ্ছন্দ্যকে কেমনভাবে ত‍্যাগ করেছিলেন তা ভাবলেই অবাক হয়ে যা! ছেলেদের সাথে সাথে মেয়েরাও পিছিয়ে ছিলেন না। তাঁরাও কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নিজেদের জীবন বাজি রেখে বিপ্লবের পথে এগিয়ে গিয়েছিলেন। 

 

আজ সেইরকমই অগ্নিযুগের অগ্নিকন‍্যা ভারতের প্রথম শহীদ প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের কথা বলব। 


জন্ম ও বংশ পরিচয় 


জন্মস্থান :  অধুনা বাংলাদেশের চট্টগ্রামের এক  মধ্যবিত্ত ব্রাহ্মণ-বৈদ‍্য পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। 

জন্ম তারিখ,সাল :  ৫ই মে, ১৯১১ সালে। 

ডাক নাম : রাণী। 

ভাই-বোন : তাঁরা ৬ ভাই-বোন ছিলেন। তিনি দ্বিতীয় ছিলেন। 

ভাই-বোনেরা হলেন, মধুসূদন, প্রীতিলতা, কনকলতা, শান্তিলতা, আশালতা এবং সন্তোষ। 

পিতা : জগবন্ধু ওয়াদ্দেদার। তিনি ছিলেন চট্টগ্রাম পৌরসভার হেড ক্লার্ক।

মাতা : প্রতিভাময়ী দেবী। তিনি গৃহবধূ ছিলেন। 

আত্মীয়া : অ‍্যাশ সরকার। 

 

শিক্ষা 

বড় ভাইয়ের গৃহশিক্ষকের কাছে চুপিসারে গোপনে প্রীতিলতা পড়াশুনা করার চেষ্টা করতেন। লেখাপড়ার প্রতি উৎসাহ এবং মায়ের ঐকান্তিক আকাঙ্ক্ষা ও প্রচেষ্টায় সাত বছর বয়সে প্রীতিলতা চট্টগ্রামের ডা. খাস্তগীর বালিকা বিদ্যালয়ে ভর্তি হলেন। এই বিদ‍্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণী থেকে তিনি প্রতি শ্রেণীতেই প্রথম স্থান অধিকার করে সকলের প্রিয়পাত্রে হয়ে উঠেছিলেন।

প্রীতিলতার মাধ্যমিক পাশের সার্টিফিকেট

 

প্রীতিলতা অষ্টম শ্রেণিতে বৃত্তি পান এবং ১৯২৭ সালে প্রথম বিভাগে মাধ্যমিক পাশ করেন। 

শিক্ষকদের মধ্যে একজন ছিলেন ইতিহাসের ঊষা দি। তিনি প্রীতিলতাকে পুরুষের বেশে ঝাঁসীর রানী লক্ষ্মীবাঈয়ের ইংরেজ সৈন্যদের সাথে লড়াইয়ের ইতিহাস বলতেন। স্কুলে তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের একজন ছিলেন কল্পনা দত্ত। এক বছরের বড় প্রীতিলতা কল্পনার সাথে ব্যাডমিন্টন খেলতেন। তাদের স্বপ্নের কথা পরবর্তী কালে লিখেছিলেন কল্পনা দত্ত। লিখেছিলেন

“কোন কোন সময় আমরা স্বপ্ন দেখতাম বড় বিজ্ঞানী হব। সেই সময়ে ঝাঁসীর রানী আমাদের চেতনাকে উদ্দীপ্ত করে। নিজেদেরকে আমরা অকুতোভয় বিপ্লবী হিসাবে দেখা শুরু করলাম।”

তিনি ১৯২৯ সালে ঢাকা ইডেন মহিলা কলেজে ভর্তি হন এবং উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় ঢাকা বোর্ডে প্রথম স্থান অধিকার করেন। 

উচ্চ শিক্ষার জন্য কলকাতায় পড়তে এলেন প্রীতিলতা। উচ্চ মাধ‍্যমিক পরীক্ষার দুই বৎসর পর প্রীতিলতা কলকাতার বেথুন কলেজ থেকে দর্শনশাস্ত্রে ডিস্টিংশনসহ গ্রাজুয়েশন পাশ করেন। 

ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে যুক্ত থাকার জন‍্য কৃতিত্ত্বের সাথে স্নাতক পাশ করলেও তাঁর ও বীণা দাশগুপ্তের পরীক্ষার ফল স্থগিত রাখা হয়। পরবর্তীকালে ২২ শে মার্চ ২০১২ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে মরণোত্তর স্নাতক ডিগ্রী প্রদান করা হয় দুই অগ্নিকন‍্যাকে। 

কর্মজীবন 

ইডেন কলেজের ছাত্রী থাকাকালীন প্রীতিলতা,  লীলা নাগের নেতৃত্বাধীন দীপালি সংঘের অন্তর্ভুক্ত শ্রীসংঘের সদস্য এবং কলকাতার বেথুন কলেজের ছাত্রী থাকাকালীন কল্যাণী দাসের নেতৃত্বাধীন ছাত্রীসংঘের সদস্য হন। গ্রাজুয়েশন করার পর তিনি চট্টগ্রামের নন্দনকানন অপর্ণাচরণ নামক একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে যোগদান করেন।


বিপ্লবী জীবন 

মাস্টারদা'র সাথে সাক্ষা 


১৯৩০ সালে সমগ্র বাংলা জুড়ে অনেক বিপ্লবী দল সংগ্রামরত ছিল। ঐসব দলের সদস্যরা বিশ্বাস করত যে, কেবল সশস্ত্র বিপ্লবের মধ্য দিয়ে ভারতের স্বাধীনতা অর্জিত হতে পারে। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের গোপন দলিলপত্র পাঠ করে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার বিপ্লবের মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ হন। প্রীতিলতার এক ভাই মাস্টারদাকে তাঁর বিপ্লবী চেতনা সম্পর্কে অবহিত করেন। 

কলকাতায় পড়তে এসে তাঁর সঙ্গে পরিচয় হল সূর্য সেনের। প্রীতিলতা ডাকতেন ‘মাস্টারদা’ বলে। প্রীতির দলে যোগ দেওয়া নিয়ে আপত্তিও এসেছিল একাধিক সদস্যের কাছ থেকে। তাসত্ত্বেও প্রীতিলতা মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বাধীন বিপ্লবী দলের প্রথম মহিলা সদস্য হন। 


মাস্টার দা এবং প্রীতিলতার প্রথম সাক্ষাতের বর্ণনাতে মাস্টারদা সূর্যসেন  লিখেছিলেন,

তাঁর চোখেমুখে একটা আনন্দের আভাস দেখলাম। এতদূর পথ হেঁটে এসেছে, তার জন্য তাঁর চেহারায় ক্লান্তির কোন চিহ্নই লক্ষ্য করলাম না। যে আনন্দের আভা তাঁর চোখে মুখে দেখলাম, তার মধ্যে আতিশয্য নেই, Fickleness নেই, Sincerity শ্রদ্ধার ভাব তাঁর মধ্যে ফুটে উঠেছে। একজন উচ্চশিক্ষিত cultured lady একটি পর্ণকুটিরের মধ্যে আমার সামনে এসে আমাকে প্রণাম করে উঠে বিনীতভাবে আমার দিকে দাঁড়িয়ে রইল, মাথায় হাত দিয়ে নীরবে তাঁকে আশীর্ব্বাদ করলাম…”।

 
রামকৃষ্ণ বিশ্বাসের সাথে তাঁর দেখা হওয়ার ইতিবৃত্ত, রামকৃষ্ণের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা ইত্যাদি বিষয় নিয়ে প্রীতিলতা প্রায় দুই ঘণ্টার মতো মাস্টারদার সাথে কথা বলেছিলেন। মাস্টারদা আরো লিখেছেন “ওর action করার আগ্রহ সে পরিষ্কার ভাবেই জানাল। বসে বসে যে মেয়েদের organise করা, organisation চালান প্রভৃতি কাজের দিকে তাঁর প্রবৃত্তি নেই, ইচ্ছাও নেই বলে।"


তিনি একাধিক দুঃসাহসিক বৈপ্লবিক কর্মকান্ডে যুক্ত ছিলেন। তিনি টেলিফোন ও টেলিগ্রাফ অফিস ধ্বংস এবং রিজার্ভ পুলিশ লাইন দখল অভিযানে যুক্ত ছিলেন। তিনি জালালাবাদ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।

পরবর্তী ঘটনা : 

অস্ত্রাগার লুন্ঠন 


১৯৩০ এর চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের সময় প্রীতিলতার বয়স ছিল কুড়ি। সূর্য সেন, গণেশ ঘোষ, লোকনাথ বল, অম্বিকা চক্রবর্তী, আনন্দ প্রসাদ গুপ্ত, ত্রিপুরা সেন, কল্পনা দত্ত, হিমাংশু সেন, বিনোদ বিহারী চৌধুরী, সুবোধ রায় এবং মনোরঞ্জন ভট্টাচার্যের সঙ্গে প্রীতিলতা এবং দলের অন্যান্যরা ঠিক করলেন ব্রিটিশদের অস্ত্রাগার লুট করবেন তাঁরা, টেলিফোন আর টেলিগ্রাফ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেবেন। অস্ত্রাগার লুট করতে যদিও সফল হননি তাঁরা, তবে টেলিফোন আর টেলিগ্রাফের সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করতে পেরেছিলেন।
তাঁদের দলের অনেকেই গ্রেফতার হলেন। প্রীতিলতা আর দলের অন্য কয়েকজন সদস্য পালাতে সফল হলেন।


ধলঘাটের ঘটনা 


তিন দিন ধরে ধলঘাট গ্রামে সাবিত্রী দেবীর বাড়িতে থাকার পর অস্ত্রের নিশানা ও চালনা সম্পর্কে প্রীতিলতা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছিলেন। ১৯৩২ সালে চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহের দুই বছর অতিক্রম হয়ে গেল। ইতোমধ্যে বিপ্লবীদের অনেকেই নিহত এবং অনেকেই গ্রেপ্তার হয়েছেন। এই বছরগুলোতে আক্রমণের নানা পরিকল্পনার পরেও শেষ পর্যন্ত বিপ্লবীরা নতুন কোনো সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। এসব পরিকল্পনার মূলে ছিলেন মাস্টারদা এবং নির্মল সেন। এই দুজন আত্মগোপণকারী বিপ্লবী তখনো গ্রাম থেকে গ্রামে বিভিন্ন আশ্রয়স্থলে ঘুরে ঘুরে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছিলেন।

এই আশ্রয়স্থলগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল ধলঘাটে সাবিত্রী দেবীর টিনের ছাউনি দেয়া মাটির দোতলা বাড়িটি। পটিয়া উপজেলার ধলঘাট গ্রামটা ছিল বিপ্লবীদের অতি শক্তিশালী গোপন আস্তানা। চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন এবং জালালাবাদ যুদ্ধের পর থেকে এই গ্রামে ছিলো মিলিটারি ক্যাম্প। এই ক্যাম্প থেকে সেনারা বিভিন্ন বাড়িতে গিয়ে আত্মগোপনরত বিপ্লবীদের ধরার চেষ্টা করতো।


সাবিত্রী দেবীর বাড়ি ছিল ওই ক্যাম্প থেকে দশ মিনিটের দূরত্বে অবস্থিত। বিপ্লবীদের কাছে ওই বাড়ির গোপন নাম ছিল “আশ্রম”। বিধবা সাবিত্রী দেবী, এক ছেলে এবং বিবাহিতা মেয়েকে নিয়ে ওই বাড়িতে থাকতেন। বিপ্লবীদের কাছে তিনি পরিচিত  ছিলেন “সাবিত্রী মাসিমা” নামে। এই আশ্রমে বসে সূর্য সেন এবং নির্মল সেন অন্যান্য বিপ্লবীদের সঙ্গে সাক্ষা করতেন এবং আলোচনা করে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিতেন। অনেক সময় এই বাড়িতেই তারা দেশ বিদেশের বিপ্লবীদের লেখা বই পড়ে এবং নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা লিখে সময় কাটাতেন।

১৯৩২ সালের ১২ জুন তুমুল ঝড়-বৃষ্টির দিনে মাস্টারদার পাঠানো এক লোক  প্রীতিলতাকে আশ্রমে নিয়ে আসেন। বাড়িতে প্রীতিলতা তার মাকে বলেন তিনি  সীতাকুণ্ডে যাচ্ছেন। মাস্টারদা এবং নির্মল সেন ছাড়া ওই বাড়িতে তখন ডিনামাইট ষড়যন্ত্র মামলার পলাতক আসামি তরুণ বিপ্লবী অপূর্ব সেন (বিপ্লবী ভোলা) অবস্থান করছিলেন। ১৩ জুন সন্ধ্যায় সূর্য সেন এবং তার সহযোগীদের সাবিত্রী দেবীর বাড়িতে অবস্থানের কথা পটিয়া পুলিশ ক্যাম্প জানতে পারে। এর আগে মে মাসেই ইংরেজ প্রশাসন মাস্টার দা এবং নির্মল সেনকে জীবিত অথবা মৃত অবস্থায় ধরিয়ে দিতে পারলে ১০ হাজার টাকা পুরস্কার ঘোষণা করে।

ক্যাম্পের অফিসার-ইন-চার্জ ক্যাপ্টেন ক্যামেরন খবরটা জানার পর ওই বাড়িতে অভিযানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। পুরস্কার এবং পদোন্নতির আশা নিয়ে ক্যাপ্টেন ক্যামেরন দুজন সাব-ইন্সপেক্টর, সাত জন সিপাহী, একজন হাবিলদার এবং দুজন কনস্টেবল নিয়ে রাত প্রায় ৯টার দিকে ধলঘাটের ওই বাড়িতে উপস্থিত হলেন। এর একটু আগেই মাস্টারদা এবং প্রীতিলতা দোতলা বাড়ির নিচতলার রান্নাঘরে ভাত খেতে বসেছিলেন। জ্বরের কারণে নির্মল সেন এবং ভোলা রাতের খাবার খাওয়া বাদ দিয়ে ওপরের তলায় শুয়ে ছিলেন। মাস্টারদার সাথে খেতে বসে অস্বস্তি বোধ করায় প্রীতিলতা ওপরে চলে যান। এমন সময় মাস্টারদা ঘরের ভেতরের মই বেয়ে দোতলায় উঠে বলেন “নির্মলবাবু, পুলিশ এসেছে”।

মাস্টারদা প্রীতিলতাকে নিচে নেমে এসে মেয়েদের সাথে থাকার নির্দেশ দেন। ততক্ষণে সিপাহী এবং কনস্টেবলরা ঘর ঘিরে ফেলেছে। ক্যাপ্টেন ক্যামেরন এবং সাব-ইন্সপেক্টর মনোরঞ্জন বোস ধাক্কা দিয়ে দরজা খুলে ঘরের একতলায় থাকা সাবিত্রী দেবী ও তার ছেলে মেয়েকে দেখতে পান। “ঘরে আর কে আছে?” এ প্রশ্ন করে কোনো উত্তর না পাওয়া অভিযান পরিচালনাকারীরা এসময় ঘরের উপরের তলায় পায়ের আওয়াজের শব্দ শুনতে পান।

ক্যাপ্টেন ক্যামেরন হাতে রিভলভার নিয়ে ঘরের বাইরের সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠার সিদ্ধান্ত নেন। সিঁড়ির মাথায় পৌঁছে বন্ধ দরজায় ধাক্কা দিতেই নির্মল সেনের করা দুইটা গুলিতে ক্যাপ্টেন ক্যামেরন মারা যান। গুলির শব্দ পাওয়ার পরেই ঘরের চারিদিকে থাকা সৈন্যরা চারিদিক থেকে প্রচণ্ড গুলিবর্ষণ শুরু করে। একটা গুলি এসে নির্মল সেনের বুকে লাগে এবং প্রচুর রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু হয়। টাকা পয়সা এবং কাগজপত্র গুছিয়ে প্রীতিলতা ও অপূর্ব সেনকে সঙ্গে নিয়ে মাস্টারদা অন্ধকারে ঘরের বাইরে আসেন। এই সময়ে আমের শুকনো পাতায় পা পড়ার শব্দ পেয়ে আশেপাশে থাকা সিপাহীদের চালানো গুলিতে সবার আগে থাকা অপূর্ব সেন মারা যান।

মাস্টারদা আর প্রীতিলতা সেই রাতে কচুরিপানা ভরা পুকুরে সাঁতার কেটে আর কর্দমাক্ত পথ পাড়ি দিয়ে পটিয়ার কাশীয়াইশ গ্রামে দলের কর্মী সারোয়াতলী স্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্র মনিলাল দত্তের বাড়িতে গিয়ে পৌঁছান। মণিলাল ওই বাড়ির গৃহশিক্ষক ছিলেন। মাস্টারদার জন্য রামকৃষ্ণ বিশ্বাসের সাথে সাক্ষাৎকারের বিস্তারিত বিবরণ লিখে ধলঘাটে এনেছিলেন প্রীতিলতা। সে পান্ডুলিপি পুকুরের মধ্যে হারিয়ে গেছিল। তাদেরকে নিরাপদ কোনো আশ্রয়ে নিয়ে যেতে বলেন মাস্টারদা।

মণিলাল দত্ত তাদেরকে ধলঘাট থেকে ছয় কিলোমিটার দূরে পাহাড়, জঙ্গল এবং নদীর কাছাকাছি একটা গ্রাম জৈষ্ট্যপুরায় নিয়ে যেতে মনস্থির করলেন। পুলিশ এলে পাহাড় এবং জঙ্গলে লুকিয়ে থাকা যাবে অথবা নদী পার হয়ে অন্য আশ্রয়ে যাওয়া যাবে। মাস্টারদা সূর্য সেন পরের দিন প্রীতিলতাকে বাড়ি যাওয়ার নির্দেশ দেন। এর আগে সূর্য সেনের নির্দেশে মণিলাল প্রীতিলতার বাসায় পুলিশের নজরদারি আছে কিনা তা জানতে শহরে খোঁজ নিয়েছিলেন। “সব কিছু ঠিক আছে” জানার পর প্রীতিলতাকে বাড়ি গিয়ে স্কুল শিক্ষকের দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেয়া হয়।

ধলঘাট সংঘর্ষের সে রাতেই গোলাগুলিতে ক্যাপ্টেন ক্যামেরনের মৃত্যুর পর পুলিশের এসআই মনোরঞ্জন বোস পটিয়ার মিলিটারি ক্যাম্পে গিয়ে আরো ত্রিশ জন সৈন্য এবং একটা লুইস গান নিয়ে সাবিত্রী দেবীর বাড়িতে ফিরে আসে। লুইস গানের গুলিবর্ষণে বাড়িটা প্রায় ধ্বংস হয়ে যায়।

সকালে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ সুপারিন্টেন্ডেন্ট ও সেনাধ্যক্ষ মেজর গর্ডন দলবল নিয়ে ঘটনাস্থলে আসেন। সাবিত্রী দেবী এবং তার ছেলে মেয়েকে বিপ্লবীদের আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। তার মেয়ে স্নেহলতার জবানবন্দিতে আরো তিন যুবক—দীনেশ দাশগুপ্ত, অজিত বিশ্বাস এবং মনীন্দ্র দাশকে আটক করা হয়। পরবর্তীকালে সাবিত্রী দেবী, তার পুত্র রামকৃষ্ণ এবং এই তিন যুবককে বিপ্লবীদের আশ্রয় এবং সহায়তা করার দায়ে চার বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। ঘরের ভেতর চালানো তল্লাশিতে রিভলভার, রামকৃষ্ণ বিশ্বাসের দুইটা ছবি, পাশাপাশি দুইটা মেয়ের ছবি (যার মধ্যে একজন ছিল প্রীতিলতা) সহ কিছু চিঠি এবং দুইটা বইয়ের পান্ডুলিপি পাওয়া যায়।

ধলঘাটে ছবি পাওয়ার পর ১৯শে জুন পুলিশ বাসায় গিয়ে প্রীতিলতাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। ২২শে জুন এসআই শৈলেন্দ্র সেনগুপ্ত এর নেতৃত্বে একটি দল ওই বাড়িতে আরেক দফা তল্লাশি চালায়। তার নির্দেশে আশেপাশের সব জঙ্গল কেটে পরিষ্কার করা হয়। জঙ্গল এবং আশেপাশের পুকুরে তল্লাশিতে অনেক কাগজপত্র উদ্ধার করা হয় যা থেকে প্রমাণিত হয় চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহের পর আত্মগোপনে থেকেও বিপ্লবীরা তাদের আদর্শের সাথে বিভিন্ন প্রবন্ধ পড়া এবং সামরিক প্রশিক্ষণ চালিয়ে যাচ্ছিলো।

তল্লাশি অভিযানে আত্মীয় পরিচয় দিয়ে অমিতা দাশের (প্রীতিলতার) আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে ফাঁসির প্রতীক্ষারত রামকৃষ্ণ বিশ্বাসের সাথে সাক্ষাতের হাতে লেখা একটি বিবরণী পাওয়া যায়। ওই হাতের লেখার সাথে মেলানোর জন্য ৩০শে জুন প্রীতিলতার বাসা থেকে পুলিশ তার গানের একটা বই নিয়ে যায়। মাস্টারদা প্রীতিলতাকে আত্মগোপনের নির্দেশ দেন। ৫ জুলাই মনিলাল দত্ত এবং বীরেশ্বর রায়ের সাথে ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে প্রীতিলতা আত্মগোপন করে। ছাত্রী পড়ানোর কথা বলে তিনি বাড়ি ত্যাগ করেছিলেন।

তার বাবা জগবন্ধু ওয়াদ্দেদার তখন অনেক খোঁজ খবর করেও মেয়ের কোনো সন্ধান পাননি। ব্যর্থ হয়ে যখন থানায় খবরটা জানানো হলো, পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের ইন্সপেক্টর যোগেন গুপ্ত আরেক নারী বিপ্লবী কল্পনা দত্তের বাড়িতে যান। কল্পনা দত্ত ওই ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে লিখেছিলেন,

 আমাদের বাসায় এসে গোয়েন্দা বিভাগের ইন্সপেক্টর বলে এত শান্তশিষ্ট নম্র মেয়ে ও, এত সুন্দর করে কথা বলতে পারে, ভাবতেও পারি না তার ভিতর এত কিছু আছে! আমাদের খুব ফাঁকি দিয়ে সে পালিয়ে গেল।”

চট্টগ্রাম শহরের গোপন আস্তানায় কিছু দিন কাটিয়ে প্রীতিলতা পড়ৈকড়া গ্রামের রমণী চক্রবর্তীর বাড়িতে আশ্রয় নেন। বিপ্লবীদের আরেক গোপন আস্তানা এই বাড়িটার সাংকেতিক নাম ছিল “কুন্তলা”। এই বাড়িতে তখন আত্মগোপনে ছিলেন মাস্টারদা এবং তারকেশ্বর দস্তিদার। প্রীতিলতার আত্মগোপনের খবর ১৩ জুলাই ১৯৩২ আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল।


চট্টগ্রামের পলাতকা” শিরোনামের এই সংবাদে লেখা হয়

“চট্টগ্রাম জেলার পটিয়া থানার ধলঘাটের শ্রীমতী প্রীতি ওয়াদ্দাদার গত ৫ই জুলাই, মঙ্গলবার চট্টগ্রাম শহর হইতে অন্তর্ধান করিয়াছেন। তাঁহার বয়স ১৯ বৎসর। পুলিশ তাঁহার সন্ধানের জন্য ব্যস্ত।”


১৯৩২ সালের ১৩ জুন ধলঘাট সংঘর্ষে কয়েকজন বিপ্লবী প্রাণ হারান। মাস্টারদা ও প্রীতিলতা পালাতে সক্ষম হন। শিগগির পুলিশের জরুরি গ্রেফতারি তালিকায় প্রীতিলতার নাম অন্তর্ভুক্ত হয়। মাস্টারদা তাঁকে স্কুল ছেড়ে দিয়ে পুরুষ বিপ্লবীদের মতো আত্মগোপন করার নির্দেশ দেন। প্রীতিলতা অপর একজন বিপ্লবী নারী কল্পনা দত্তসহ গোপন আস্তানায় চলে যান। 


ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণ 


মাস পাঁচেক পর সুর্য সেনের ভাবনা মতোই পাহারতলীর ইওরোপিয়ান ক্লাব হামলার পরিকল্পনা ছিল। প্রীতিলতা পাহাড়তলীতে ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি সেই দলের প্রধান ছিলেন। ইওরোপিয়ান ক্লাবের বাইরে তখন গোটা গোটা অক্ষরে লেখা থাকত “ডগস অ্যান্ড ইন্ডিয়ান্স আর নট অ্যালাউড”।


প্রীতিলতার নেতৃত্বে ১০ জনের একটি দল শিখে নিল কীভাবে অস্ত্র চালাতে হয়, কী ভাবে প্রয়োজন পড়লে খেয়ে নিতে হয় পটাশিয়াম সায়ানাইড। ১৯৩২ সালের ২৩শে সেপ্টেম্বর রাতে হামলা হল ইওরোপিয়ান ক্লাবে। ১৯৩০ সালের ১৮ই এপ্রিল চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহের অন্যতম পরিকল্পনা ছিল পাহাড়তলী ইউরোপীয়ান ক্লাব আক্রমণ। কিন্তু গুড ফ্রাইডের কারণে সেদিনের ওই পরিকল্পনা সফল করা যায়নি। চট্টগ্রাম শহরের উত্তরদিকে পাহাড়তলী স্টেশনের কাছে এই ক্লাব ছিল ব্রিটিশদের প্রমোদকেন্দ্র। পাহাড় ঘেরা এই ক্লাবের চতুর্দিকে প্রহরীদের অবস্থান ছিল। একমাত্র শ্বেতাঙ্গরা ছাড়া এবং ক্লাবের কর্মচারী, বয়-বেয়ারা, দারোয়ান ছাড়া এদেশীয় কেউ ওই ক্লাবের ধারে কাছে যেতে পারতো না। ক্লাবের সামনের সাইনবোর্ডে লেখা ছিল “কুকুর এবং ভারতীয়দের প্রবেশ নিষেধ”। সন্ধ্যা থেকেই ইংরেজরা এই ক্লাবে এসে মদ খেয়ে নাচ, গান এবং আনন্দ উল্লাস করতো। আত্মগোপনকারী বিপ্লবীরা ইউরোপীয় ক্লাব আক্রমণের জন্য নতুনভাবে পরিকল্পনা শুরু করে। চট্টগ্রাম শহরের কাছে দক্ষিণ কাট্টলী গ্রামে ওই ক্লাবেরই একজন বেয়ারা যোগেশ মজুমদারের বাড়িতে বিপ্লবীরা আশ্রয় পেলেন।


১৯৩২ সালের ১০ই আগস্ট ইউরোপীয় ক্লাব আক্রমণের দিন ধার্য করা হয়। শৈলেশ্বর চক্রবর্তীর নেতৃত্বে সাত জনের একটা দল সেদিন ক্লাব আক্রমণ করতে গিয়েও ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসেন। শৈলেশ্বর চক্রবর্তীর প্রতিজ্ঞা ছিল ক্লাব আক্রমণের কাজ শেষ হবার পর নিরাপদ আশ্রয়ে ফেরার যদি সুযোগ থাকে তবুও তিনি আত্মবিসর্জন দেবেন। তিনি পটাশিয়াম সায়ানাইড খেয়ে আত্মহত্যা করেন। গভীর রাতে কাট্টলীর সমুদ্রসৈকতে তাকে সমাহিত করা হয়েছিল।


মাস্টারদা ১৯৩২ এর সেপ্টেম্বর মাসে আবার ইউরোপিয়ান ক্লাবে হামলা করার সিদ্ধান্ত নিলেন। এই আক্রমণের দায়িত্ব তিনি নারী বিপ্লবীদের ওপর দেবেন বলেন মনস্থির করেছিলেন। কিন্তু সাত দিন আগেই পুলিশের হাতে পুরুষবেশী কল্পনা দত্ত ধরা পরে গেলে আক্রমণে নেতৃত্বের ভার পড়ে একমাত্র নারী বিপ্লবী প্রীতিলতার ওপর।


২৩শে সেপ্টেম্বরের  আক্রমণে প্রীতিলতার পরনে ছিল মালকোঁচা দেওয়া ধুতি আর পাঞ্জাবি, চুল ঢাকা দেবার জন্য মাথায় সাদা পাগড়ি, পায়ে রবার সোলের জুতা। ইউরোপীয় ক্লাবের পাশেই ছিল পাঞ্জাবিদের কোয়ার্টার। এর পাশ দিয়ে যেতে হবে বলেই প্রীতিলতাকে পাঞ্জাবি ছেলেদের মতো পোশাক পরানো হয়েছিল। আক্রমণে অংশ নেওয়া কালী কিংকর দে, বীরেশ্বর রায়, প্রফুল্ল দাস, শান্তি চক্রবর্তীর পোশাক ছিল ধুতি আর শার্ট। লুঙ্গি আর শার্ট পরনে ছিল মহেন্দ্র চৌধুরী, সুশীল দে আর পান্না সেনের।

বিপ্লবীদের আশ্রয়দাতা যোগেশ মজুমদার (বিপ্লবীদের দেওয়া তাঁর গোপন নাম ছিল 'জয়দ্রথ'।) ক্লাবের ভেতর থেকে রাত আনুমানিক ১০টা ৪৫মিনিটে আক্রমণের ইঙ্গিত আসার পরেই ক্লাবে আক্রমণ করা হয়। সেদিন ছিল শনিবার, আনুমানিক প্রায় ৪০ জন মানুষ তখন ক্লাবঘরে অবস্থান করছিল।

তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে অস্ত্র হাতে বিপ্লবীরা ক্লাব আক্রমণ শুরু করেন। পূর্বদিকের গেট দিয়ে ওয়েবলি রিভলভার এবং বোমা নিয়ে আক্রমণের দায়িত্বে ছিলেন প্রীতিলতা, শান্তি চক্রবর্তী আর কালীকিংকর দে। ওয়েবলি রিভলভার নিয়ে সুশীল দে আর মহেন্দ্র চৌধুরী ক্লাবের দক্ষিণের দরজা দিয়ে এবং ৯ ঘড়া পিস্তল নিয়ে বীরেশ্বর রায়, রাইফেল আর হাতবোমা নিয়ে পান্না সেন আর প্রফুল্ল দাস ক্লাবের উত্তরের জানালা দিয়ে আক্রমণ শুরু করেছিলেন।

প্রীতিলতা হুইসেল বাজিয়ে আক্রমণ শুরুর নির্দেশ দেয়ার পরেই ঘন ঘন গুলি আর বোমার আঘাতে পুরো ক্লাব কেঁপে কেঁপে উঠছিল। ক্লাবঘরের সব বাতি নিভে যাবার কারণে সবাই অন্ধকারে ছুটোছুটি করছিল। ক্লাবে কয়েকজন ইংরেজ অফিসারের কাছে রিভলবার ছিল। তারাও পাল্টা আক্রমণ করেছিল।

একজন মিলিটারি অফিসারের রিভলভারের গুলিতে প্রীতিলতার বাঁ-পাশে গুলির আঘাত লাগে। প্রীতিলতার নির্দেশে আক্রমণ শেষ হলে বিপ্লবী দলের সাথে তিনি কিছুদূর এগিয়ে আসেন। পুলিশের রিপোর্ট অনুযায়ী সেদিনের এই আক্রমণে মিসেস সুলিভান নামে একজন নিহত হয় এবং চার জন পুরুষ এবং সাত জন নারী আহত হয়।


আহত অবস্থায় প্রীতিলতার ধরা পড়ার আশঙ্কা বেড়ে যায়। তাই পাহাড়তলী ইউরোপীয় ক্লাব আক্রমণ শেষে পূর্ব সিদ্বান্ত অনুযায়ী প্রীতিলতা পটাসিয়াম সায়ানাইড মুখে পুরে নেন। কালীকিংকর দে’র কাছে তিনি তাঁর রিভলভারটি দিয়ে আরও পটাশিয়াম সায়ানাইড চাইলে, কালীকিংকর তা প্রীতিলতার মুখের মধ্যে ঢেলে দেন।


পটাসিয়াম সায়ানাইড খেয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়া প্রীতিলতাকে বিপ্লবী শ্রদ্ধা জানিয়ে সবাই স্থান ত্যাগ করে। পরদিন পুলিশ ক্লাব থেকে ১০০ গজ দূরে তাঁর শবদেহ পড়ে থাকতে দেখা যায়। শবদেহ যে প্রীতিলতার তা সনাক্ত করা হয়। এরপর, তাঁর শবদেহ তল্লাশি করা হয়। তাঁর কাছ থেকে বিপ্লবী লিফলেট, অপারেশনের পরিকল্পনা, বিভলভারের গুলি, রামকৃষ্ণ বিশ্বাসের ছবি এবং একটা হুইসেল পাওয়া যায়। ময়না তদন্তের পর জানা যায়, গুলির আঘাত তেমন গুরুতর ছিল না বরং পটাশিয়াম সায়ানাইড-এর জন‍্যই তাঁর মৃত্যুর হয়। 

বেঙ্গল চিফ সেক্রেটারি প্রীতিলতার মৃত্যুর পর লন্ডনে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো একটা রিপোর্ট লিখেছিলেন। সেখানে তিনি লিখেছিলেন, "Pritilata had been closely associated with, if not actually the mistress of, the terrorist Biswas who was hanged for the murder of Inspector Tarini Mukherjee, and some reports indicate that she was the wife of Nirmal Sen who was killed while attempting to evade arrest of Dhalghat, where Captain Cameron fell."

প্রীতিলতার মৃত্যুর পর তাঁর পরিবারের অবস্থা নিয়ে কল্পনা দত্ত লিখেছেন-

“প্রীতির বাবা শোকে দুঃখে পাগলের মত হয়ে গেলেন, কিন্তু প্রীতির মা গর্ব করে বলতেন, ‘আমার মেয়ে দেশের কাজে প্রাণ দিয়েছে’। তাঁদের দুঃখের পরিসীমা ছিল না, তবু তিনি সে দুঃখেকে দুঃখ মনে করেননি। ধাত্রীর কাজ নিয়ে তিনি সংসার চালিয়ে নিয়েছেন, আজো তাঁদের সেভাবে চলছে। প্রীতির বাবা প্রীতির দুঃখ ভুলতে পারেননি। আমাকে দেখলেই তাঁর প্রীতির কথা মনে পড়ে যায়, দীর্ঘনিশ্বাস ফেলেন”।

 


 রামকৃষ্ণের সান্নিধ্য বদলে দিয়েছিল প্রীতিলতার জীবন 

আমাদের জীবনে অনেক মানুষ আসে যাদের সান্নিধ্যে জীবনের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হয়ে যায়। আমরা আবার নতুন করে সবকিছু ভাবতে শিখি। মনে হয়, কই আগে তো কেউ এইভাবে বলে নি এইরকম ভাবেও ভাবা যায় প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের জীবনও এসেছিলেন সেইরকমই একজন মানুষ। তিনি রামকৃষ্ণ। তবে পরমহংস নন। ইনি বিপ্লবী রামকৃষ্ণ বিশ্বাস। যাঁকে ফাঁসির আগের প্রতিটি দিন খুব কাছে থেকে দেখেছিলেন বিপ্লবী প্রীতিলতা। আর সেই সাক্ষাৎ বদলে দিয়েছিল তাঁর জীবন। ব্রতী করেছিল দেশের জন্য আত্মত্যাগে। প্রীতিলতার শবদেহের সঙ্গে একটি নিজের হাতের লেখা চিঠি পাওয়া গিয়েছিল। তা থেকেই সেই তথ্য মেলে।।


ভূপেন্দ্রকিশোর রক্ষিত রায়ের’ ‘ভারতে সশস্ত্র বিপ্লব’ বই থেকে মেলে সেই চিঠি। নিজের সম্বন্ধে লিখেছিলেন প্রীতিলতা। সেই কথা লিখতে গিয়েই চলে আসে রামকৃষ্ণ বিশ্বাসের কথাও। প্রীতিলতা লিখেছিলেন

১৯৩০ সালে পড়বার উদ্দেশ্যে কলকাতা চলে এসেছিলাম। আমার কোনও এক বিপ্লবী ভাইয়ের নির্দেশে আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে বন্দী রামকৃষ্ণ বিশ্বাসের সঙ্গে দেখা করার জন্য তৈরি হলাম। মৃত্যুপথযাত্রী রামকৃষ্ণ। দেশকে ভালবাসার অপরাধে ব্রিটিশ কানুনের শৃঙ্খলে বন্দী রামকৃষ্ণ ফাঁসির আগ্রহে অপেক্ষমান। আমি ‘কাজিন সিস্টার’ সেজে কোন ক্রমে রামকৃষ্ণের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার অনুমতি আদায় করলাম। প্রত্যেকদিন যেতাম হাসি-খুশি সপ্রতিভ ঐ বীরকে দেখার জন্যে। তাঁর ফাঁসি মঞ্চে আরোহণের পূর্বে আমি অন্ততঃ চল্লিশটি ইন্টারভিউ নিয়েছিলাম। তাঁর সমাহিত রূপ, অপকট আলাপ-আলোচনা, মৃত্যুর তপস্যায় প্রশান্ত আত্মসমর্পণ, দ্বন্দহীন ভগবৎ ভক্তি, শিশু সুলভ সারল্য, প্রেমস্নিগ্ধ হৃদয়াবেগ, গভীর জ্ঞান, নিবিড় আত্মানুভূতি আমাকে উদ্বুদ্ধ করেছিল; দুঃসাহসিকতার পথে চলবার সামর্থ্য আমার দশগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল। রামকৃষ্ণদার ফাঁসির পরে সক্রিয়ভাবে বৈপ্লবিক কোন এ্যাকশনে যাবার আগ্রহ আমার প্রচণ্ড হয়ে ওঠে।


কে এই রামকৃষ্ণ বিশ্বাস। কেন তাঁর ফাঁসি হয়েছিল

রামকৃষ্ণ বিশ্বাসের ঘটনা অনেকটা ক্ষুদিরাম বসুর মতো। এক অত্যাচারী ইংরেজ পুলিশকে হত্যা করতে গিয়ে অন্য একজনকে হত্যা করে ফেলেছিলেন। সালটা ছিল ১৯৩০। বাংলার ইন্সপেক্টর জেনারেল অফ পুলিশ টিজে ক্রেগ। তিনি চট্টগ্রাম সফরে এসেছিলেন। অত্যাচারী ইংরেজ পুলিশকে হত্যা করার জন্য মাষ্টারদা সূর্য দেন দায়িত্ব দিয়েছিলেন রামকৃষ্ণ বিশ্বাস এবং কালীপদ চক্রবর্তীর উপর। ২রা ডিসেম্বর চাঁদপুর রেলস্টেশনে ক্রেগকে লক্ষ্য করে গুলি চালালেও তা লাগে এসডিও তারিণী মুখার্জির দেহে। সেই গুলি মরণ গুলি! বাঁচেন নি তারিণী মুখার্জি। বোমা, রিভলবারসহ গ্রেফতার হন রামকৃষ্ণ বিশ্বাস এবং কালীপদ চক্রবর্তী।


রামকৃষ্ণ বিশ্বাসের মৃত্যুদন্ড হয়। কালীপদ চক্রবর্তীকে নির্বাসনে পাঠানো হয়। চট্টগ্রাম থেকে আলিপুর। বহু দূর। খরচ বেশি। রামকৃষ্ণের সঙ্গে দেখা করতে কেউ আসত না। বিপ্লবী মনোরঞ্জন রায় প্রীতিলতাকে চিঠি লিখে সেই কথা জানিয়েছিলেন। সাথে তিনি বিপ্লবীর সঙ্গে দেখা করতেও বলেছিলেন।


রামকৃষ্ণের কাজিন পরিচয় দিয়ে আলিপুর জেলের কাছে দরখাস্ত করেন প্রীতিলতা। জেল কর্তৃপক্ষও অনুমতি দিয়েছিল। ১৯৩০ সালে প্রীতিলতা কলকাতাস্থ আলীপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত রাজবন্দি রামকৃষ্ণের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাত করেন। এরপর তিনি চল্লিশবার রামকৃষ্ণ বিশ্বাসের সঙ্গে সাক্ষাত করেন ।১৯৩১, ঠা আগস্ট, রামকৃষ্ণ বিশ্বাসের ফাঁসী হয়ে যায়। বদলে যায় প্রীতিলতার জীবন।

 

পরলোক গমন 


যদিও সশস্ত্র বিপ্লবের পথ তিনি বেছে নিয়েছিলেন, কিন্তু ব‍্যক্তিগত ভাবে তিনি অযথা নিরীহ প্রাণী হত‍্যা করার বিপক্ষে ছিলেন।  কল্পনা দত্ত ১৯৩০ সালে প্রীতিলতার বাড়িতে এক আলাপচারিতা প্রসঙ্গে লিখেছেন –

“কথা হচ্ছিল, পাঁঠা কাটতে পারব কি না। আমি বলেছিলাম, ‘নিশ্চয় পারব, আমার মোটেই ভয় করে না’। প্রীতি উত্তর দিয়েছিল ‘ভয়ের প্রশ্ন না, কিন্তু আমি পারব না নিরীহ একটা জীবকে হত্যা করতে’। একজন তৎক্ষণাৎ প্রশ্ন করল ‘কী, দেশের স্বাধীনতার জন্যও তুমি অহিংস উপায়ে সংগ্রাম করতে চাও?’ আমার মনে পড়ে প্রীতির স্পষ্ট জবাব, ‘স্বাধীনতার জন্য প্রাণ দিতেও পারব, প্রাণ নিতে মোটেই মায়া হবে না। কিন্তু নিরীহ জীব হত্যা করতে সত্যি মায়া হয়, পারব না।’




দৃঢ়চেতা, স্বদেশপ্রেমী প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার

 ২৪ শে সেপ্টেম্বর ১৯৩২ সালে ২১ বছর বয়সে  দেশমাতৃকাকে রক্ষা করতে করতে নিজের জীবন ত‍্যাগ করলেন। 

যদিও প্রীতিলতার মৃত্যু নিয়ে বেশ কিছু মতবিরোধ রয়ে গেছে, কিন্তু তাতে তার বীরত্ব কিছুমাত্র কমে যায়নি। বরং যুগে যুগে মানুষের মনে তার বীরত্বের গল্প নতুন করে স্থান পেয়েছে, অনুপ্রাণিত করেছে হাজার হাজার দেশপ্রেমিককে। আর আজও তাই এই উপমহাদেশে সকল শ্রেণির মানুষ শ্রদ্ধাভরে তাঁকে স্মরণ করেন। মনে রাখেন তাঁর এক অদম্য সাহসকে। 

"মুক্তির মন্দির সোপানতলে                 কত প্রাণ হলো বলিদান,

লেখা আছে অশ্রুজলে

কত বিপ্লবী বন্ধুর রক্তে রাঙা                   বন্দীশালার ওই শিকল ভাঙা,

তারা কি ফিরিবে আজ সুপ্রভাতে,

যত তরুণ-অরুণ গেছে অস্তাচলে?

যারা স্বর্গগত তারা এখনো জানে স্বর্গের চেয়ে প্রিয় জন্মভূমি,

আজ স্বদেশব্রতে মহাদীক্ষা লভি সেই মৃত্যুঞ্জয়ীদের চরণ চুমি।"

-      মোহিনী চৌধুরী



তম স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষ্যে আমরা আমাদের দেশের সকল বিপ্লবীদের কাছে শ‍্রদ্ধার সাথে মাথা নত করলাম। তাঁরা না থাকলে আজও আমাদের আরও অনেক অত‍্যাচার সহ‍্য করতে হত। যাঁরা আজও বিভিন্নভাবে বিভিন্নদিকে দেশের জন‍্য কিছু না কিছু করছেন তাঁরা সকলেই বিনম্র শ্রদ্ধার পাত্র। 

 

চিত্র সৌজন্যঃ rumansblog.wordpress.com

তথ্যসুত্রঃ প্রীতিলতা – শংকর ঘোষ


কলমে - সোমা লাই  

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন