
সূর্য থেকে আগুন-ঝরা তাপে ধরণী যখন উত্তপ্ত হয়, পৃথিবীর ফসলভরা মাঠ তখন রিক্ত। আষাঢ়ে সেই শুকিয়ে যাওয়া জীবনে করুণাধারায় নেমে আসে বৃষ্টি। মেঘ যেন এক কৃষ্ণবর্ণ বিশালদেহী গম্ভীর পুরুষ। তার বৃষ্টি-ঔরসে পৃথিবীর বুকে সৃষ্টির বীজ বপন হয়। নদী-নালা ভরে ওঠে। গাছপালা সজীব হয়। আমাদের পৃথিবী-মা যেন সত্যি ঋতুমতী হয়ে ওঠেন। পৃথিবী থেকে সূর্য তার তাপ দিয়ে জল চুরি করে বাষ্পের আকারে। পৃথিবীর শরীরে জল বৃদ্ধি হয় অম্বুবাচীর সময়। অম্বুবাচী আসলে কৃষির উৎসব। নব ফসলের জন্ম দেওয়ার সূচনা। সূর্য আষাঢ় মাসে যে দিন মিথুন রাশিতে আর্দ্রা নক্ষত্রের প্রথম পাদে গমন করে, সেই সময় থেকে মাতৃস্বরূপা পৃথিবী ঋতুমতী হন। আষাঢ় মাসের প্রথম ছ’দিন চল্লিশ দণ্ডে মৃগশিরা নক্ষত্রের শেষ দুই পাদে সূর্যের ভোগ হয়। তার পরে যে তিন দিন বিশ দণ্ড পর্যন্ত সূর্য আর্দ্রা নক্ষত্রের প্রথম পাদে থাকেন, তা-ই অম্বুবাচী। সূর্যের দক্ষিণায়নের দিন থেকে তিন দিন অর্থাৎ, আষাঢ় মাসের ৭ থেকে ১০ তারিখ পর্যন্ত দিনগুলিতে অম্বুবাচী পালন করা হয়। এই কটি দিন জমিতে লাঙ্গল দেওয়া বা বীজ বোনা নিষেধ - ঋতুকালে নারীর পুরুষসংসর্গ নিষিদ্ধ যে জন্যে ঠিক সেই কারণেই। এই 'সংযম' পালনের সূত্রেই উপবাস এবং অরন্ধনের প্রথা আরোপিত হয়েছে পরে। ঋতুর ঠিক পরবর্তী দিনগুলি যেমন নারীর পক্ষে সন্তান ধারণের জন্য প্রশস্ততম, ঠিক তেমনই অম্বুবাচীর পরবর্তী সময়টাই ফসল ফলানোর পক্ষে সবচেয়ে শ্রেয়কাল বলে মনে করা হয়েছে।
নতুন বর্ষার মুখপাতে পৃথিবী যখন প্রথম সিক্ত হয়ে ওঠে, তখন তাঁকে প্রথম ঋতুমতী নারীরূপে চিত্রিত করার আদিম সংস্কারই অম্বুবাচীর
উৎস। এই সময়ে তাঁকে তিন দিন বিশ্রাম দেওয়া হয়। চাষিরা ওই তিন দিন কোনও কৃষিকাজ
করেন না। অম্বুবাচীর তিন দিন ধরিত্রীর ঋতুকাল ধরে নিয়ে চাষে বিরত থাকেন। তাঁরা মনে
করেন, এই তিন দিন বর্ষার জলে সিক্ত হয়ে ধরিত্রী চাষের উপযোগী
হয়ে উঠবে। অম্বুবাচীর আগের দিনটিকে বলা হয় ‘অম্বুবাচী প্রবৃত্তি’। তিন দিনের পরের
দিনটিকে বলা হয় ‘অম্বুবাচী নিবৃত্তি’। এর পরেই চাষিরা আবার চাষ-আবাদ শুরু করতে
পারেন।
আমাদের সামাজিক জীবনেও এই ধর্মীয় আচারটির যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে। যে তিন দিন অম্বুবাচী পালন করা হয় সেই দিনগুলিতে কোনও মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান, যেমন, গৃহপ্রবেশ, বিবাহ, উপনয়ন ইত্যাদি অনুষ্ঠিত হয় না। শুধু তা-ই নয়, কিছু কাজ যেমন, বেদ পাঠ, ভূমি কর্ষণ, বীজ বপন, দেব-পিতৃ তর্পণও বন্ধ রাখা হয়। অম্বুবাচী উপলক্ষে গ্রামবাংলার বিধবা মহিলারা তিন দিন ধরে ব্রত রাখেন। অম্বুবাচীর আগের দিন তাঁরা তিন দিনের প্রয়োজনীয় খাবার রান্না করে রাখেন। এই সময় আগুনের আঁচে গরম করা কোনও খাবার তাঁরা খান না। তবে কোথাও কোথাও সূর্যের তাপে খাবার গরম করে নেওয়ার প্রথাও প্রচলিত আছে। আবার যাঁরা ব্রহ্মচর্য পালন করেন, তাঁরা এই সময়ে আমিষ খাবার খান না। বিভিন্ন ধরনের ফলমূল খেয়ে তাঁরা ব্রত উদ্যাপন করেন। এই বিশ্বাস এবং অম্বুবাচীর পারণ, দুটোই আদিম কৌম সমাজের প্রজননশক্তির পূজা এবং তার সাথে সম্পৃক্ত ধ্যান-ধারণার সঙ্গে জড়িত বলে পণ্ডিত গবেষকদের অভিমত। অম্বুবাচীর ক্ষেত্রে উর্বরতাকেন্দ্রিক ভাবনায় নারী এবং ধরিত্রী যেন সমার্থক হয়ে ওঠে। অম্বুবাচী একটি ধর্মীয় আচার হলেও এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আমাদের আমাদের প্রাচীন কৃষি পদ্ধতিও।
ভারতবর্ষের ইতিহাসে পৃথিবীকে মাতা ও দেবীরূপে দেখার চলন খুবই আদিম। মহেঞ্জোদারো ও হরপ্পাতে প্রাপ্ত নারীমূর্তিগুলির অনেকেই প্রাচীন মাতৃকা মূর্তি বলে পণ্ডিতগণরা অনুমান করে থাকেন। এই মাতৃকামূর্তিগুলির মধ্যে অনেকই আবার মাতা পৃথিবীর মূর্তি বলে ধারণা করা যায়। শস্যোৎপাদিনী পৃথিবীই তখন ছিলেন মাতৃদেবতা; প্রাণ শক্তি ও প্রজননশক্তির প্রতীকরূপে তিনি প্রাচীন কাল থেকেই পূজিতা। বৈদিক সাহিত্যে পৃথিবীর মাতৃদেবীরূপে বর্ণনা অতি প্রসিদ্ধ। অবশ্য এক্ষেত্রে একটি বিষয় লক্ষণীয়, ঋগবেদে যেখানেই তিনি মাতারূপে স্তুত হয়েছেন, বেশিরভাগ জায়গাতেই আমরা তাঁকে পিতা 'দ্যৌ' এর সাথে একত্রে দেখতে পাই। ঋগবেদে মন্ত্রদ্রষ্টা ঋষি বলছেন,
"দ্যৌর্মে পিতা জনিতা নাভিরত্র বন্ধুর্মে মাতা পৃথিবী মহীয়ম্।
উত্তানয়োশ্চম্বো র্যোনিরন্তরত্রা পিতা
দুহিতুর্গর্ভমাধাৎ।।(১/১৬৪/৩৩)"
নিত্যং ন সয়নুং পিত্রোরুপস্থে দ্যাবা রক্ষতং পৃথিবী
নো অভ্বাৎ।।(১/১৮৫/২)
বিশ্বদেবা অদিতিঃ পঞ্চজনা
অদিতির্জাতমদিতির্জনিত্বম।।”(১/৮৯/১০)
জ্যোতিষ্মৎ ক্ষত্রমাসাতে আদিত্যা দামূনস্পতী
মিত্রস্তয়োর্বরুণো যাতযজ্জনোর্যমা যাতযজ্জনঃ ॥ (১/১৩৬/৩)
"ইয়ং বাহদিতির্মহী।”– এই পৃথিবীই
অদিতি। (শঃ ব্রাঃ ৬/৫/১/১০)
“ইয়ং হ্যেবাদিতিঃ।”— এই পৃথিবীই
অদিতি। (শঃ ব্রাঃ ৩/২/৩/৬)
“ইয়ং বৈ দেব্যদিতিবিশ্বরূপী।”– এই
বিশ্বরূপী পৃথিবীটাই অদিতি। (তৈঃ ব্রাঃ ১/৭/৬/৬)
আবার, প্রাচীন বিশ্বাস অনুসারে রক্তবর্ণ উর্বরতার প্রতীক। হয়তো আরো অনেক কিছুই
প্রাচীন জাদুবিশ্বাসে উর্বরতার প্রতীক হিসেবে উপস্থাপিত হয়। কিন্তু রক্তরঙের
প্রতীকটিকে প্রাচীন মানবগোষ্ঠির বিভিন্ন জাতি ও সমাজে তাৎপর্যময়রূপে উর্বরাশক্তির
প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হতে দেখা যায় বলে নৃতত্ত্ববিদেরা মনে করেন। কোথাও ডালিম
প্রতীকে, কোথাও সিঁদুর প্রতীকে, কোথাও
বা অন্যকিছু। রজ-রক্তের সঙ্গে উর্বরতার প্রসঙ্গ অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত- তা সে নারীর
হোক বা পৃথ্বীর।
তথ্যসূত্রঃ-
১. পূজা পার্বণের উৎসকথা – পল্লব সেনগুপ্ত
২. মাতৃকাশক্তি ও বাঙালির ভাবজগতে নারী প্রাধান্যের বলিষ্ঠ উপাদান – রণদীপম
বসু
৩. অম্বুবাচী বা চাষীর ছুটি – শ্রীচিন্তাহরণ চক্রবর্তী
৪. পুরাণকোষ – নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী...
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন