- বই - পাউডার কৌটোর টেলিস্কোপ
- লেখক - স্বপ্নময় চক্রবর্তী
- প্রথম প্রকাশ – জানুয়ারী ২০১৬
- প্রকাশনী – মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড
- প্রচ্ছদশিল্পী – দেবাশিস সাহা
- পৃষ্ঠা সংখ্যা - ১৪৫
- মুদ্রিত মূল্য – ২০০/-
মেদিনীপুরের
প্রত্যন্ত এক গ্রাম সাউরি। এই গ্রামের এক অত্যন্ত দরিদ্র সংসারের সন্তান নারায়ন
চন্দ্র রানা। গ্রামের ভোলানাথ প্রাইমারি স্কুলে পড়তে গিয়ে শিক্ষক মনীন্দ্র
নারায়ন লাহিড়ীর সংস্পর্শে বালক নারায়ন চন্দ্রের সাথে পরিচয় ঘটে চাঁদ তারা গ্রহ
নক্ষত্র সম্বলিত অসীম আকাশের। শিশুমনে বিশাল আকাশের রহস্য পৃথিবীর মানব জীবনের
জটিল রহস্যের তুলনায় অনেক বেশি আকর্ষণ তৈরি করে। বিশাল আকাশের শূন্যতা যে
প্রকৃতপক্ষে কোটি কোটি গ্রহ নক্ষত্র গ্রহানু পুঞ্জসহ আরো বহু সৌরলোকের অবস্থান,
তা জানার এবং বিশ্বকে সেই সমস্ত রহস্যের খোঁজ দেওয়ার কাজে নিজের
দুর্বল হৃদয় সম্বলিত জীবন উৎসর্গ করেন। আবিস্কার করেন সূর্যের ব্যাসের প্রকৃত
পরিমাপ। ক্ষণজন্মা বিজ্ঞানী ডঃ নারায়ন চন্দ্র রানা নিজের কীর্তিতে
জ্যোতির্বিজ্ঞান জগতে স্বর্ণাক্ষরে নিজের নাম লিখে যান। সাথে নিজের জীবনের
ধ্রুবতারা স্বরূপ শিক্ষককেও গর্বিত ও বিখ্যাত করে যান পৃথিবীর কাছে। এক নগণ্য
অখ্যাত গ্রামের অতি দীন সাধারণ পরিবারের সন্তানের আকাশের তারা হয়ে ওঠার কাহিনী
লিপিবদ্ধ করেছেন বিখ্যাত সাহিত্যিক স্বপ্নময় চক্রবর্তী। তাঁর লেখা "পাউডার
কৌটোর টেলিস্কোপ" স্মৃতি থেকে হারিয়ে যাওয়া এক বিজ্ঞানীর অসাধ্য সাধনের
আখ্যান বর্ণনা করে।
গত মাস খানেক
খুন জখম রহস্য গোয়েন্দা ভূত প্রেত তন্ত্রের মিলিত খিচুড়ি গল্পকথা পড়ে হাঁপিয়ে
গিয়ে যখন চোয়াঢেঁকুর তুলে বমির উপক্রম করছিলাম ঠিক তখনই বইয়ের তাকে এই বইটা
নজরে আসে। একটু আনমনেই বইটা বের করে পড়তে শুরু করি। তন্ত্র মন্ত্রের দুর্বোধ্য
জটিল প্রক্রিয়া ও গোয়েন্দা বাহিনীর উড়ন্ত পড়ন্ত দুর্দান্ত মস্তিষ্কের কারসাজি
পড়ার ফলে গা-মাথায় যে এক বিরক্তিকর ভনভনানি শুরু হয়েছিল, এই বইয়ের মাত্র দু তিনপাতা পড়ার পর থেকেই তা প্রশমিত হতে শুরু করল।
ধীরে ধীরে মাথা মনে অদ্ভুত এক ভালোলাগা ছড়িয়ে পড়তে লাগল। এক গ্লাস নিমপাতার রস
খাওয়ার পর আধা কাপ মধু খেলে যে তৃপ্তি লাভ হয় ঠিক সেই রকম অনুভুতি।
জীবন যেন এক
লহমায় প্রায় ৭০/৮০ বছর পিছিয়ে গেল। এক অজানা অচেনা অনুন্নত অজ পাড়াগাঁয়ের এক আদর্শবান শিক্ষক মণিলাল
স্যারের সাথে সাথে ঘুরে বেড়াতে লাগলাম। যেন চোখের সামনে এক অন্ন-বস্ত্রহীন শিশুর যাবতীয় প্রতিকূলতার সাথে অসম
লড়াই প্রত্যক্ষ করলাম।মণিলাল স্যার, যাঁর একমাত্র স্বপ্ন ছিল নিজের ছাত্রদের আকাশ ভর্তি
স্বপ্ন দেখানো এবং সেই স্বপ্নের পিছনে ছুটে তাকে সত্যি করে দেখানোর রাস্তায় এগিয়ে দেওয়ার।
যাতে সেই সমস্ত সফল কৃতি ছাত্ররা স্বর্ণাক্ষরে নিজেদের নাম ইতিহাসের পাতায় লিখে যেতে
পারে। কিন্তু যাদের পেটের জন্য ভাতের দানা জোগাড় করাই ছিল জীবনের সবথেকে বড় লড়াই, তারা
কি করে আকাশকে ছুঁয়ে দেখার কথা ভাবতে পারে! কিন্তু সেই হত দরিদ্র অভুক্তদের মধ্যে থেকেও
রুগ্ন, শীর্ণ, অল্পেই হাঁপিয়ে পড়া নয়নচাঁদ ঘরামি আকাশ ছুঁতে চেয়েছিল। যে এক সামান্য পাউডার কৌটো দিয়ে তৈরি করা টেলিস্কোপে চোখ রেখে অনন্ত
আকাশকে মুঠো বন্দী করার স্বপ্ন দেখেছিল এবং সেই স্বপ্নকে সফল করেছিল। তাঁর সেই
প্রায় অমানবিক লড়াইয়ের সঙ্গী ছিলেন মণিলাল স্যার ও অনন্যা। তাঁদের
সেই লড়াইয়ে নিজেও যোগ দিলাম। তাঁদের আনন্দে হাসলাম,
দুঃখে কাঁদলাম, প্রেমে পড়লাম, জয়ে জয়ী হলাম। বাংলার এক প্রত্যন্ত গ্রামের ছাত্রের আকাশের সবচেয়ে
উজ্জ্বল নক্ষত্রকে ছুঁয়ে ফেলে এক অসাধ্য সাধন করে স্বর্ণাক্ষরে নিজের নাম আকাশের তারাদের
দলেই লিখে যাওয়া সম্ভব হয়েছিল।
আশ্চর্য এক
মায়াময় লেখা। হাতে গোনা মাত্র কয়েকটি চরিত্র ও তাঁদের জীবনকথা। বই শেষ হয়ে গেল। ঘড়ির কাঁটায় রাত সাড়ে তিনটে। আর কিছুক্ষণ পরেই
ভোরের আলো ফুটবে। জানলা খুলে আকাশের দিকে তাকালাম। মিটমিট করে ধ্রুবতারা ফিকে হেসে
উঠলো। বুকের ওপর বইটা নিয়ে নিজের হৃদয়ের শব্দ শুনতে শুনতে আকাশে খুঁজছিলাম ‘নয়ন’ নামের এক তারা। সাথে ভিড় করে আসছে আরো
কিছু মুখ। মণিলাল স্যার,মানী, অনন্যা... চোখের জল বালিশ
ভিজিয়ে দিচ্ছে। পুবাকাশে কমলাভা ছড়িয়ে দিয়ে অরুণ যেন সেই ঘোর কাটিয়ে দিল।সূর্যের
দিকে তাকালাম। আলোর ছটায় কি সব হারিয়ে যায়? নাকি সেও
আছে অন্য কোথাও অন্য কোনো কোনো বিশ্বে লুকিয়ে? করে চলেছে
এক নিরলস সাধনা। বিশ্বকে চিনবার। বিশ্বকে চেনাবার। টেলিস্কোপে চোখ রেখে....
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন